মেনু নির্বাচন করুন
পাতা

প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব

৯নং হাটিকুমরুল ইউনিয়নে প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব ২জন

 

 

১।মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ

২০১৪ নভেম্বর ২৭ ০০:০৪:৩২

মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ

দ্য রিপোর্ট ডেস্ক : ভারতীয় উপমহাদেশের বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ ১৯০০ সালের ২৭ নভেম্বর সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়ার তারুটিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৮০ এর দশকে বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।

মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশের পূর্বপুরুষ বড়পীর হযরত আবদুল কাদির জিলানী (রঃ) এর বংশধর শাহ সৈয়দ দরবেশ মাহমুদ ১৩০৩ সালে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে বাগদাদ থেকে বাংলাদেশে আসেন। শৈশব থেকেই তর্কবাগীশের মধ্যে দেশপ্রেমের উন্মেষ ঘটে৷ ১৩ বছর বয়সে তিনি জমিদার মহাজনদের বিরুদ্ধে দুধ বিক্রেতাদের সংগঠিত করে দুধের ন্যায্যমূল্য দিতে মহাজনদের বাধ্য করেন৷

১৯১৯ সালে মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ খিলাফত আন্দোলন ও অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দেন৷ ১৯২২ সালে ব্রিটিশবিরোধী ঐতিহাসিক ‘সলংগা আন্দোলন’ এ নেতৃত্ব দেন, যার জন্য তাকে কারাভোগ করতে হয়৷ এ বিদ্রোহ ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে ‘রক্তসিঁড়ি’ হিসেবে পরিচিত৷ ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ায় তার এন্ট্রান্স পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করা হয়নি৷ পরবর্তীকালে তিনি যুক্ত প্রদেশের বেরেলি ইশতুল উলুম মাদ্রাসা, সাহারানপুর মাদ্রাসা, দেওবন্দ মাদ্রাসা ও লাহোরের এশাতুল ইসলাম কলেজে পড়েন এবং তর্কশাস্ত্রে ডিগ্রি অর্জন করে তর্কবাগীশ উপাধিতে ভূষিত হন৷ তিনি ১৯৩৩ সালে রাজশাহীর চাঁটকৈড়ে নিখিলবঙ্গ রায়ত খাতক সম্মেলন আহ্বান করে ঋণ সালিশী বোর্ড আইন প্রণয়নের প্রস্তাব রাখেন৷ ১৯৩৭ সালে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে নাটোরে কৃষক সম্মেলন আহ্বান করেন৷

তিনি বিশিষ্ট রাজনীতিক হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ঘনিষ্ঠ সহচর ছিলেন৷ ১৯৩৮ সালে সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে বাংলা, আসাম ও ভারতের বিভিন্ন স্থানে সাংগঠনিক কাজে আত্মনিয়োগ করেন৷ ১৯৪৬ সালে বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন৷ মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ অবিভক্ত বাংলার এমএলএ হিসেবে তৎকালীন ব্যবস্থাপক পরিষদে পতিতাবৃত্তি নিরোধ, বাধ্যতামূলক অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা ও বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদারী প্রথা উচ্ছেদের প্রস্তাব উত্থাপন করেন৷

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সভাপতিত্বে গঠিত ইউনাইটেড মুসলিম পার্টির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ৷ পরবর্তীকালে তিনি নিখিল ভারত মুসলিম লীগে যোগ দেন৷ তিনি ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান কৃষক সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি৷ তর্কবাগীশ ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলা ভাষার অধিকার আদায়ে সংগ্রামরত ছাত্র জনতার উপর পুলিশী নির্যাতনের সংবাদ পেয়ে প্রাদেশিক পরিষদ থেকে বেরিয়ে এসে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন৷ ২২ ফেব্রুয়ারি মুসলিম লীগ ত্যাগ করে প্রাদেশিক পরিষদে বিরোধী দল গঠন করেন এবং নুরুল আমিন সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনেন। ২৩ ফেব্রুয়ারি তাকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়৷ আওয়ামী লীগের দলীয় সদস্য হিসেবে পাকিস্তান গণপরিষদে ১৯৫৫ সালের ১২ আগস্ট তিনিই প্রথম বাংলা ভাষায় বক্তৃতা করেন। মাওলানা তর্কবাগীশ ১৯৫৬ থেকে ১৯৬৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন৷ ১৯৭০ সালের নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন৷

মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ অনেক বই লিখেছেন। উল্লেখযোগ্য হলো— শেষ প্রেরিত নবী, সত্যার্থে ভ্রমণে, ইসলামের স্বর্ণযুগের ছিন্ন পৃষ্ঠা, সমকালীন জীবনবোধ, স্মৃতির সৈকতে আমি ও ইসমাইল হোসেন সিরাজী৷

স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে গৌরবোজ্জ্বল ও কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে ‘স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার ২০০০’ (মরণোত্তর) প্রদান করা হয়৷ এ ছাড়া তার অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তার নামে কিছু প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে— নুরুন্নাহার তর্কবাগীশ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ (রায়গঞ্জ), চড়িয়া মাওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশ বিজ্ঞান মাদ্রাসা (উল্লাপাড়া), পাটধারী মাওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশ উচ্চ বিদ্যালয় (সলংগা, উল্লাপাড়া), মাওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশ পাঠাগার ও মাওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশ ফাউন্ডেশন।

মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ ১৯৮৬ সালের ২০ আগস্ট মারা যান।

 

২।পন্ডিত মোহাম্মদ নজিবর রহমান সাহিত্য-রত্ন

 

বাংলা কথা-সাহিত্যে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য মুসলিম কথা-সাহিত্যিক হলেন পন্ডিত মোহাম্মদ নজিবর রহমান সাহিত্য-রত্ন (১৮৬০-১৯২৩)। নজিবর রহমান পূর্ববর্তীতের ধারা অনুসরণ করে সাহিত্য-ক্ষেত্রে আবির্ভূত হলেও নানা কারণে তিনি বাংলা কথা-সাহিত্যে বিশিষ্ট স্থান অধিকার করেন। তাঁর রচিত ‘আনোয়ারা' (১৯১৪) উপন্যাস একসময় মুসলিম-রচিত প্রথম সার্থক সামাজিক উপন্যাস হিসাবে জনপ্রিয়তার শীর্ষে স্থান লাভ করে।

নজিবর রহমানের জন্ম সিরাজগঞ্জ জেলার অন্তর্গত শাহজাদপুর থানার চর বেলতৈল গ্রামে। চর বেলতৈলের পার্শ্ববর্তী গ্রামের নাম বেলতৈল। অনেকে ভুলবশত তাঁর গ্রামের নাম বেলতৈল বলে উল্লেখ করেছেন।১ তাঁর জন্মকাল সম্পর্কেও বিশিষ্ট গবেষক নাজিরুল ইসলাম মোহাম্মদ সুফিয়ান বলেন ঃ ‘‘তাঁহার জন্ম তারিখ সরকারি লোয়ার সাবোর্ডিনেট এডুকেশনাল সার্ভিসের লিস্ট অনুসারে ১৮৭৮। চাকরীর বয়স অনেক সময় কিছু কম থাকে। কেহ কেহ তাঁহার জন্ম তারিখ ১৮৬০ খৃ. মনে করেন।’’২ ডক্টর মুহম্মদ এনামুল হকও সরকারি রেকর্ড অনুযায়ী নজিবর রহমানের জন্ম ১৮৭৮ সন বলে উল্লেখ করেছেন।৩ ডক্টর গোলাম সাকলায়েন নজিবর রহমানের জন্ম সন ১৮৬০ বলে উল্লেখ করেছেন।৪ মুস্তফা নূরউল ইসলামের ‘মুসলিম বাংলা সাহিত্য', অধ্যাপক মুহম্মদ আব্দুল হাই ও সৈয়দ আলী আহসান প্রণীত ‘বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত' (আধুনিক যুগ) গ্রন্থদ্বয়েও নজিবর রহমানের জন্ম সন ১৮৭৮ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ থেকে মনে হয়, সরকারি নথিই এঁরা সকলে আশ্রয় করেছেন। ১৯৫৭-৫৮ সনে আমি (লেখক) আমার নিজ গ্রাম চর বেলতৈলের প্রবীণ ও নজিবর রহমানের নিকটাত্মীয়দের মধ্যে তথ্যানুসন্ধান চালিয়ে যে ধারণায় উপনীত হয়েছিলাম, সে অনুযায়ী আমার এক প্রবন্ধে লেখকের জন্ম সন ১৮৫২ বলে উল্লেখ করি।৫ অধ্যাপক মনসুর উদ্দিন আমার ঐ প্রবন্ধের বরাত দিয়ে নজিবর রহমানের জন্ম সন ১৮৫২ বলে উল্লেখ করেন।৬ ডক্টর আনিসুজ্জামান, আ.কা.শ. নূর মোহাম্মদ, আবুল হাসনাত, কবি-সমালোচক আব্দুল কাদির, গবেষক বুলবুল ইসলাম প্রমুখ সকলেই নজিবর রহমানের জন্ম সন ১৮৬০ বলে উল্লেখ করেছেন। ডক্টর গোলাম সাকলায়েন তাঁর পূর্বোক্ত প্রবন্ধে লেখকের জন্ম সন ১৮৬০ বলে উল্লেখ করেও বাক্যের ভিতর বন্ধনীর সাহায্যে লিখেছেন, ‘মতান্তরে ১৮৪৭ খ্রি.'। ডক্টর মাযহারুল ইসলাম বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে লেখকের জন্ম সন বাংলা ১২৬০-১২৬৬ অর্থাৎ ইংরাজী ১৮৫৪-৬০-এর মধ্যে বলে অনুমান করেছেন।৭ পরবর্তীকালে৮ আমি লেখকের পারিবারিক সূত্রের বরাত দিয়ে লেখকের জন্ম ১৮৬০ সনের ২২শে জানুয়ারী বলে উল্লেখ করেছি। এ যাবত নজিবর রহমানের জন্ম সন বিভিন্নভাবে অনেকেই উল্লেখ করলেও তাঁর জন্ম তারিখ সম্পর্কে কেউ কোন তথ্য সরবরাহ করেননি। আমার অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য মতে তাঁর জন্ম তারিখ হলো ২২ জানুয়ারী। এ তথ্যটি আমি তাঁর উত্তর-পুরুষদের নিকট থেকে পেয়েছি।৯ নজিবর রহমানের মৃত্যুর সন-তারিখ নিয়েও নানারূপ ধারণা বিদ্যমান। তবে এ সম্পর্কে ডক্টর গোলাম সাকলায়েনের দেয়া তথ্যটি সঠিক ও নির্ভরযোগ্য বলে মনে হয়। ডক্টর গোলাম সাকলায়েন কলকাতার সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘সোলতান' (নব পর্যায়)-এর ৯ই কার্তিক, শুক্রবার, ১৩৩০ (৮ম বর্ষ, ২৩শ' সংখ্যা, ২৬শে অক্টোবর, ১৯২৩)-এর বরাত দিয়ে ১৮ই অক্টোবর, ১৯২৩ নজিবর রহমানের মৃত্যু দিবস বলে উল্লেখ করেছেন।

নজিবর রহমান প্রধানত ঔপন্যাসিক। তবে তিনি কয়েকটি গল্প ও দুটি প্রবন্ধ পুস্তকও রচনা করেন। তিনি কতিপয় পাঠ্য-পুস্তকও রচনা করেন বলে জনশ্রুতি আছে। কিন্তু এ সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু অবগত হওয়া যায় না। তাঁর রচিত যে সব বইয়ের নাম জানা যায়, সেসব বইয়ের সন্ধান পাওয়া যেমন দুরূহ, তেমনি সেগুলো ব্যতীত তিনি আরো বই রচনা করেছিলেন কিনা সে সম্পর্কেও নিশ্চিত কিছু বলা কঠিন। বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তাঁর রচনাবলীর একটি তালিকা নিম্নরূপ ঃ

          এক)          ‘পূর্বস্মৃতি' ঃ কুতুবুদ্দিন আয়বক'। ১৯০১ সনের জুলাই-আগস্ট (৪র্থ বর্ষ, ১ম-২য় সংখ্যা) ‘ইসলাম প্রচারক' পত্রিকায় প্রকাশিত একটি ইতিহাস-বিষয়ক প্রবন্ধ। এটি তাঁর কোন গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়নি।

দুই)   ‘সাহিত্য প্রসঙ্গ'। এটি সাহিত্য-সংস্কৃতি-ঐতিহ্য বিষয়ক একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। প্রকাশকাল বাংলা ১৩১১, ইংরেজী ১৯০৪। প্রকাশের অল্পকাল পরেই সরকার এটি বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করে।

তিন) ‘বিলাতী বর্জন রহস্য'। প্রকাশকাল বাংলা ১৩১১, ইংরেজী ১৯০৫। এটি মুসলিম স্বাতন্ত্র্য, স্বাধীনতা-চেতনাসমৃদ্ধ একটি স্বদেশী আন্দোলন বিষয়ক গ্রন্থ। এ গ্রন্থটিও প্রকাশের অল্পকাল পরেই সরকার বাজেয়াপ্ত করে।

‘সাহিত্য-প্রসঙ্গ' ও ‘বিলাতী বর্জন রহস্য' সম্পর্কে ‘উত্তর বঙ্গে মুসলমান সাহিত্য' শীর্ষক প্রবন্ধে হামেদ আলী নামক জনৈক লেখক মন্তব্য করেন ঃ ‘‘১। বিলাতী বর্জন রহস্য, ২। সাহিত্য-প্রসঙ্গ : সলঙ্গা মাইনর স্কুলের হেড পন্ডিত মুন্শী নজিবর রহমান প্রণীত। ভাষা সাধু বাঙ্গালা। বাঙ্গালা ভাষার প্রতি ইহার বেশ অনুরাগ আছে, ইনি আরও পুস্তক লিখিতেছেন।’’১০ পর পর দু'টি প্রবন্ধ গ্রন্থই প্রকাশের সাথে সাথে সরকার বাজেয়াপ্ত করায় নজিবর রহমান সম্ভবত হতোদ্যম হয়ে পড়েন। ফলে পরবর্তীতে প্রবন্ধ না লেখায় কথাশিল্পী হিসাবে তাঁর আত্মপ্রকাশ ঘটে। তাঁর রচিত বিভিন্ন গল্প-উপন্যাসের তালিকা নিম্নরূপ ঃ

এক) ‘আনোয়ারা'। নজিবর রহমানের প্রথম ও সর্বাধিক সার্থক উপন্যাস। প্রথম প্রকাশ ১৯১৪ সনে। বাংলা ১৩৬৮ সনের চৈত্র মাসে এর সপ্তবিংশতি সংস্করণ প্রকাশিত হয় এবং ঐ সময় পর্যন্ত এর সাড়ে পাঁচ লক্ষ কপি বিক্রয় হয় বলে জানা যায়। এ থেকে এর জনপ্রিয়তা সম্পর্কে ধারণা করা চলে। ‘আনোয়ারা' একসময় কলেজে পাঠ্য-তালিকাভুক্ত ছিল। ষাটের দশকে প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক ও চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান ‘আনোয়ারা'র সফল চিত্রায়ণ করেন এবং ১৯৮৭ সনে বাংলাদেশ টেলিভিশন এর ধারাবাহিক নাট্যরূপ প্রচার করে।১১

দুই) ‘প্রেমের সমাধি'। ‘আনোয়ারা' উপন্যাসের পরিশিষ্ট হিসাবে এটি রচিত। তবে এটা যে একটি সম্পূর্ণ সামাজিক উপন্যাস তাতে কোন সন্দেহ নেই। সম্ভবত ‘আনোয়ারা'র পাঠকপ্রিয়তা লক্ষ্য করে লেখক এটিকে ‘আনোয়ারার পরিশিষ্ট' হিসাবে প্রণয়ন করেন। এটিও একটি জনপ্রিয় উপন্যাস। বাংলা ১৩৭০ সনে এর ১৯শ' সংস্করণ প্রকাশিত হয়। এ থেকে এর জনপ্রিয়তা আন্দাজ করা চলে।

তিন) ‘গরীবের মেয়ে' একটি আত্মজীবনীমূলক সামাজিক উপন্যাস। এটিও একটি জনপ্রিয় উপন্যাস। ১৯২৩ সনে প্রকাশিত এ গ্রন্থটির সপ্তদশ সংস্করণ মুদ্রিত হয় বাংলা ১৩৯৪ সনের আষাঢ় মাসে (১৯৮৭ সনের জুলাই)।

চার) ‘চাঁদ তারা বা হাসন গঙ্গা বাহমণি'। এটি একটি ঐতিহাসিক উপন্যাস।

পাঁচ) ‘পরিণাম'। এটি একটি গল্পগ্রন্থ। কবি-সমালোচক আব্দুল কাদির এ গ্রন্থটি সম্পর্কে লেখেন ঃ ‘‘নজিবর রহমানের ‘পরিণাম' উপন্যাসখানি নূতন আঙ্গিকে বিরচিত। ইহাতে তিনটি কাহিনী পরিশেষে একত্র সংযুক্ত হইয়া মনোহর পরিণতি লাভ করিয়াছে। ইহার অবয়ব নির্মাণে মোহাম্মদ দানেশের ‘চাহার দরবেশ' (১৭৭১ খ্রী.) পুঁথির অভিনব প্যাটার্ন অনুসরণের দূরূহ প্রয়াস লক্ষণীয় এবং এর বর্ণনার টেকনিক বিশ্ববিশ্রুত আলফ-লায়লা নামক আরব্য কাহিনীগুচ্ছের কথা স্মরণ করাইয়া দেয়।’’১২

ছয়)     ‘মেহেরউন্নিসা'। ১৯২৩ সনে প্রকাশিত নজিবর রহমানের সর্বশেষ সামাজিক উপন্যাস। বাংলা ১৩৩০ সনে প্রকাশিত ‘দুনিয়া আর চাইনা'র প্রথম সংস্করণে ‘মেহেরউন্নিসা' উপন্যাসের বিজ্ঞাপন দেয়া হয় এভাবে ঃ ‘‘গ্রন্থকার প্রণীত আর একখানি উৎকৃষ্ট সামাজিক উপন্যাস ‘মেহেরউন্নিসা'। ভাবে, ভাষায়, ঘটনা-বৈচিত্র্যে ও স্বাভাবিকতায় উপন্যাস জগতে তুমুল আন্দোলন উপস্থাপিত করিয়াছে। বঙ্গ সাহিত্যে অদ্যাবধি এরূপ ভাবোদ্দীপক মনোজ্ঞ উপন্যাস প্রকাশিত হয় নাই।’’ দুর্ভাগ্যবশত বইটি অধুনা দু্রাপ্য।

সাত) ‘দুনিয়া আর চাই না'। ১৯২৩ সনে প্রকাশিত। ‘যুবকের কান্ড', ঈমানের পরখ', ‘সতীর সাধনা', ‘নারীর ধৈর্য্য', ও ‘নারীর হৃদয়' শীর্ষক পাঁচটি গল্পের সংকলন।

আট) ‘নামাজের ফল'। বাংলা ১৩৩০ সনে প্রকাশিত ‘দুনিয়া আর চাই না' প্রথম সংস্করণে মুদ্রিত এক বিজ্ঞাপনে বলা হয় ঃ ‘‘গ্রন্থকারের আর একখানি উপন্যাস। উপাসনার শ্রেষ্ঠ সোপান, খোদার সান্নিধ্য লাভের একমাত্র উপায় নামাজ, সেই নামাজের উপলক্ষে গ্রন্থকার ‘নামাজের ফল' লিখিয়াছে।’’ এ গ্রন্থটিও দু্রাপ্য।

নয়) ‘বেহেস্তের ফুল'। এটিও একটি উপন্যাস। বাংলা ১৩২৭-২৮ সনে লেখক রোগ-শয্যায় এটি লিখেছিলেন।

দশ) ‘দুনিয়া কেন চাই না'। এটিও বাংলা ১৩২৭-২৮ সনে রোগ-শয্যায় লিখিত আর একখানি উপন্যাস।

এছাড়া, নজিবর রহমান কয়েকটি পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন করেন বলে জানা যায়। কিন্তু সেগুলোর কোন হদিস পাওয়া যায় না, এটা পূর্বেও উল্লেখ করেছি। তবে এ সম্পর্কে যে জনশ্রুতি রয়েছে, তা যুক্তিযুক্ত বলে মনে হয়। কেননা, তিনি সারা জীবন শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত ছিলেন, কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ ও পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা ছিল, সর্বোপরি একজন নিষ্ঠাবান, আদর্শ চরিত্রের সমাজ-হিতৈষী, জাতির কল্যাণকামী মহৎ ব্যক্তি হিসাবে মুসলিম সমাজকে শিক্ষা-দীক্ষায় উন্নতির শিখরে নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে প্রয়োজনীয় ও উপযোগী পাঠ্য-পুস্তক প্রণয়নে আত্মনিয়োগ করা তাঁর পক্ষে একান্তই স্বাভাবিক ছিল।

নজিবর রহমানের উপন্যাসকে মোট চার ভাগে বিভক্ত করা চলে। সামাজিক, ঐতিহাসিক, ধর্মীয় ও আত্ম-জৈবনিক। তাঁর সামাজিক উপন্যাসগুলোর বৈশিষ্ট্য হলো এই যে, এগুলোতে তৎকালীন গ্রাম বাংলার সমাজ-চিত্র বিশেষত মুসলিম পারিবারিক ও সমাজের চিত্র নিখুঁতভাবে রূপায়িত হয়েছে। ইতঃপূর্বে এ ধরনের চিত্র বাংলা কথাসাহিত্যে নজিবর রহমানের মতো বাস্তবনিষ্ঠভাবে আর কেউ ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হননি। ‘হাসন গঙ্গা বাহমণি' তাঁর রচিত একমাত্র ঐতিহাসিক উপন্যাস। এতে সত্যনিষ্ঠার পরিচয় পাওয়া যায়। তাঁর পূর্ববর্তী ঔপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্র যেমন সাম্প্রদায়িক মানসিকতার বশবর্তী হয়ে তাঁর রচিত ঐতিহাসিক উপন্যাসে ইতিহাসের চরম বিকৃতি ঘটিয়েছেন, নজিবর রহমান সেক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। তিনি ঐতিহাসিক সত্য তুলে ধরার সাথে সাথে সম্পূর্ণ অসাম্প্রদায়িক মনোভাবের পরিচয় দিয়েছেন। ‘গরীবের মেয়ে' তাঁর রচিত একমাত্র আত্ম-জৈবনিক উপন্যাস। এতে তিনি তাঁর নিজের ও স্ত্রীর কথা বলার সাথে সাথে পারিপার্শ্বিক অবস্থারও বর্ণনা দিয়েছেন। তবে নিজের জীবন কাহিনীর উপর ভিত্তি করে রচিত হলেও এটাকে তিনি যথাসম্ভব উপন্যাসের আদলে উপস্থাপন করার প্রয়াস পেয়েছেন। এছাড়া, বাকী উপন্যাসগুলো যথা-‘দুনিয়া আর চাই না', ‘নামাজের ফল', ‘বেহেস্তের ফুল', ‘দুনিয়া কেন চাই না' ইত্যাদি মূলত ধর্মীয় কাহিনী মূলক গ্রন্থ। শিল্প-বিচারে এগুলোকে যথার্থ উপন্যাস বলে গণ্য করা যায় না।

নজিবর রহমানের অধিকাংশ উপন্যাসই অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ‘আনোয়ারা', ‘প্রেমের সমাধি', ‘পরিণাম', ‘গরীবের মেয়ে', ‘হাসন গঙ্গা বাহমণি' প্রভৃতি উপন্যাস একসময় জনপ্রিয়তার শীর্ষে স্থান করে নেয়। বিশেষত ‘আনোয়ারা'র জনপ্রিয়তা ছিল কিংবদন্তীতুল্য। মীর মশাররফ হোসেনের ‘বিষাদ সিন্ধু'র জনপ্রিয়তার সঙ্গেই কেবল এর তুলনা চলে। নজিবর রহমানের উপন্যাসের জনপ্রিয়তার কারণগুলো নিম্নরূপভাবে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে।

নজিবর রহমান তাঁর উপন্যাসে মুসলিম সমাজের বাস্তব চিত্র অতি বিশ্বস্ততার সাথে ফুটিয়ে তুলেছেন। বাঙালি মুসলমানদের আশা-আনন্দ, প্রেম-ভালবাসা, দুঃখ-বেদনা, আচার-অনুষ্ঠান, কুটিলতা-দুর্বলতা, সফলতা-ব্যর্থতার এক জীবনধর্মী প্রাণবন্ত চিত্র এতে বাঙময় রূপ লাভ করেছে। লেখক শুধু একজন শিল্পী নয়, তিনি একজন সমাজ-হিতৈষী, সমাজের উন্নতি ও কল্যাণকামী আদর্শ মুসলিম। তাঁর উপন্যাসের চরিত্রগুলো সবই গ্রাম-বাংলার সাধারণ মানুষ। তাদের জীবনে যেমন স্বপ্ন আছে, আশা-আনন্দ-প্রেম আছে, তেমনি আছে স্খলন, পতন, দুর্বলতা ও নানারূপ সীমাবদ্ধতা। লেখক অতি বাস্তব ও সূক্ষ্ম জীবনদৃষ্টির মাধ্যমে তা অবলোকন করেছেন ও কুশলী শিল্পীর ন্যায় তার হৃদয়গ্রাহী বর্ণনা দিয়েছেন। এ শিল্পরূপ দানের ক্ষেত্রে তিনি তাঁর বিশ্বাস, শাশ্বত জীবনবোধ ও আদর্শ জীবন-চেতনায় সর্বদা উদ্বুদ্ধ থেকেছেন। ফলে তাঁর সবগুলো উপন্যাসের নায়ক-নায়িকাই হয়েছে তাঁর এ বিশ্বাস, জীবনবোধ, আদর্শ-চেতনা ও স্বকীয় স্বপ্ন-কল্পনার বিশ্বস্ত প্রতিভূ। যেকালে বাংলা সাহিত্যে, বিশেষত কথা-সাহিত্যে হিন্দু নর-নারী, হিন্দু ধর্ম-দর্শন-বিশ্বাস, আচার-আচরণ, সামাজিক রীতি-নীতি-প্রথা ব্যতীত বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের জীবন-চিত্রের কোন পরিচয়ই পাওয়া যেত না, অথবা যৎসামান্য কিছু থাকলেও তা কেবল মুসলমানদের কুৎসা রটনা ও তাদেরকে হেয় প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যেই তা সন্নিবেশিত হতো। সে রকম অবস্থায় মুসলিম সমাজ ও চরিত্র সংবলিত এ জাতীয় উপন্যাস ছিল অনেকটা অভাবিতপূর্ব। তাই মুসলিম সমাজে এ জাতীয় উপন্যাস বিপুল বিস্ময় ও উৎসাহ-উদ্দীপনার সৃষ্টি করে। ফলে প্রতিটি শিক্ষিত মুসলিম পরিবারে তৎকালে এসব উপন্যাস বিশেষ সমাদৃত হয়। যে মুসলিম সমাজে এককালে নাটক-নভেল পড়া এক রকম নিষিদ্ধ ছিল, সে সমাজে নজিবর রহমানের উপন্যাসগুলো কেবল সমাদৃতই হলো না, বিভিন্ন সামাজিক ও পারিবারিক অনুষ্ঠানে তা উপঢৌকন হিসাবে প্রদান করা একরকম রেওয়াজে পরিণত হয়। এমনকি, বিবাহযোগ্য কনেদের জন্য ঐ সময় এসব উপন্যাস পাঠ একটি বিশেষ যোগ্যতা হিসাবে বিবেচিত হয়।

নজিবর রহমানের জনপ্রিয়তার অন্যতম প্রধান কারণ হলো তাঁর অসাধারণ প্রাঞ্জল, সহজ, সরল, অনবদ্য ভাষা। মুসলিম সমাজে নিত্য ব্যবহৃত অসংখ্য আরবি-ফারসি-উর্দু শব্দ তিনি অসংকোচে ব্যবহার করেছেন। যে সময় হিন্দুরা তো বটেই মীর মশাররফ হোসেন, কায়কোবাদ, মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ, সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজীর মত প্রতিভাশালী মুসলমানরা পর্যন্ত সংস্কৃতবহুল সাধু বাংলায় সাহিত্য চর্চা করতেন, সে সময় নজিবর রহমান এক দুঃসাহসিক কাজ করেছেন বাঙালি মুসলমানের নিজস্ব শব্দ-সম্পদকে ব্যবহার করে। বিশেষত ইসলামের বিভিন্ন আরবি পরিভাষা তিনি অসংকোচে ব্যবহার করে অনেকটা দুঃসাহসের পরিচয় দিয়েছেন। এক্ষেত্রে তাঁকে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামেরও পূর্বসূরী হিসাবে আখ্যায়িত করা যায়। অবশ্য নজরুল এক্ষেত্রে তাঁকে অতিক্রম করে অনন্যসাধারণ বিস্ময়কর সাফল্য অর্জন করেছিলেন তাতে সন্দেহ নেই। তবে নজিবর রহমান এক্ষেত্রে যে অগ্রপথিকের দুঃসাহসী ভূমিকা পালন করেন তা অস্বীকার করার উপায় নেই। এ বিশেষ ভাষাভঙ্গির কারণে গ্রামের অল্পশিক্ষিত মহিলারা পর্যন্ত নজিবর রহমানের উপন্যাস অনায়াসে পাঠ করে আনন্দ লাভ করতো। তাঁর জনপ্রিয়তার মূলে এটাও একটি বিশেষ কারণ।

তাছাড়া, নজিবর রহমানের উপন্যাসের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো তাঁর অসাম্প্রদায়িক, মানবিক উদার দৃষ্টিভঙ্গী। তিনি মুসলিম সমাজের চিত্র অংকন করতে গিয়ে কখনো অসাম্প্রদায়িক মনোভাবের পরিচয় দেননি বা অমুসলমানদের জাত্যাভিমানে আঘাত লাগে এমন কোন কাজ করেননি। বরং মুসলমান চরিত্রের পাশাপাশি তিনি অমুসলিমদের চরিত্রও অংকন করেছেন সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গী থেকে। ফলে তাঁর উপন্যাসসমূহ শুধু বাঙালি মুসলমানের কাছেই নয়, অমুসলিম পাঠকের কাছেও সমাদৃত হয়েছে।

বাংলা কথা-সাহিত্যে নজিবর রহমানের অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। মুসলিম কথা-সাহিত্যিকদের মধ্যে মীর মশাররফ হোসেনের পরেই তাঁর স্থান। তাঁর পরবর্তী বিভিন্ন কথা-সাহিত্যিকগণ এ দু'জন অমর কথা-শিল্পীর পদাংক অনুসরণ করে বাংলা কথা-সাহিত্যকে বিভিন্নভাবে সমৃদ্ধ করেছেন। এঁদের মধ্যে যাঁদের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য তাঁরা হলেন- সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী (১৮৮০-১৯৩১), বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন (১৮৮০-১৯৩২), কাজী ইমদাদুল হক (১৮৮২-১৯২৬), একরাম উদ্দিন (১৮৮২-১৯৩৫), লুৎফর রহমান (১৮৯১-১৯৩৭), শাহাদৎ হোসেন (১৮৯৩-১৯৫৩), নুরুন্নেসা খাতুন (১৮৯৪-), কাজী আব্দুল ওদুদ (১৮৯৫-১৯৭৩), গোলাম মোস্তফা (১৮৯৫-১৯৬৪), কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬), আবুল ফজল (১৯০৫-৮৩), সৈয়দ মুজতবা আলী (১৯০৫-৭৪), আবু জাফর শামসুদ্দীন (১৯১১-৮৮) প্রমুখ। এঁদের বিশেষ উল্লেখযোগ্য উপন্যাসের মধ্যে ইসমাইল হোসেন সিরাজীর ‘রায় নন্দিনী' (১৯১৫), বেগম রোকেয়ার ‘সুলতানার স্বপ্ন' ও ‘অবরোধ বাসিনী', কাজী ইমদাদুল হকের ‘আবদুল্লাহ' (১৯৩৩), একরাম উদ্দিনের ‘কাঁচ ও মণি' (১৩২৫), লুৎফর রহমানের ‘পথহারা' (১৩২৬) ও ‘প্রীতি উপহার' (১৩৩৩), নুরুন্নেসার ‘স্বপ্নদ্রষ্টা' (১৯২৩), কাজী আব্দুল ওদুদের ‘নদীবক্ষে' (১৩২৫) ও ‘আজাদ', গোলাম মোস্তফার ‘রূপের নেশা' (১৩২৬), কাজী নজরুল ইসলামের ‘বাঁধন হারা' (১৯২৭) ও ‘মৃত্যুক্ষুধা' (১৯৩০), আবুল ফজলের ‘চৌচির' (১৯৩৪) ও ‘রাঙ্গা প্রভাত', সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘অবিশ্বাস্য' ও ‘শবনম', আবু জাফর শামসুদ্দীনের ‘পরিত্যক্ত স্বামী' (১৯৪৬), ‘মুক্তি' (১৯৪৭) ও ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা' (১৯৭৪) ইত্যাদি।

বাংলা উপন্যাসের যুগ-বিবর্তনের ধারায় নানা বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যায়। উপন্যাস হলো জীবন ও সমাজের রসময় বাস্তব চিত্র। জীবন ও সমাজের নানা বিবর্তন, পরিবর্তন ও উত্তরণের চিত্র স্বভাবতই রসময়ভাবে উপন্যাসে স্থান লাভ করে থাকে। মীর মশাররফ হোসেন থেকে নজিবর রহমানের কাল ভিন্ন। নজিবর রহমান থেকে তাঁর পরবর্তীদের কালও ভিন্ন এবং নানা বৈচিত্র্যে পূর্ণ। উপন্যাসে এ যুগ-বিবর্তন, জীবন-বৈচিত্র্য ও নানা বাস্তব অভিজ্ঞতার রসগ্রাহী চিত্র আমরা উপরোক্ত লেখকদের লেখায় বিভিন্নভাবে লক্ষ্য করেছি। তার সাথে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এই যে, প্রত্যেক লেখকেরই একটি নিজস্ব স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গী থাকে। তাঁদের লেখার মধ্যে এ দৃষ্টিভঙ্গীর পরিচয় ফুটে ওঠাই স্বাভাবিক। সে কারণেও উপন্যাসে বৈচিত্র্য ফুটে ওঠে।

নজিবর রহমান সাহিত্যরত্ন তাঁর উপন্যাসে সমকালীন জীবন ও সমাজকে যথাযথভাবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন। সমকালীন মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন-কল্পনা ও স্খলন-পতনকে তিনি যথাযথভাবে রূপায়িত করার প্রয়াস পেয়েছেন। তাছাড়া, মানব জীবনের কতগুলো চিরায়ত মূল্যবোধ যেমন প্রেম, ন্যায়পরায়ণতা ও মানুষের প্রতি মানুষের মমত্ববোধ ইত্যাদি তাঁর লেখায় যথাযথভাবে ফুটে উঠেছে। এজন্য তাঁর লেখা সমকালে যেমন ব্যাপকভাবে সমাদৃত ও জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে, তেমনি তা চিরকালীন মানুষের কাছেও সমাদৃত হয়েছে। এদিক থেকে তিনি যথেষ্ট সার্থকতা অর্জন করেন।

মোহাম্মদ নজিবর রহমান সাহিত্যরত্ন বাংলা কথা-সাহিত্যের এক অমর কথাশিল্পী। তবে দুর্ভাগ্যবশত তাঁর যথাযথ মূল্যায়ন হয় নি। আমাদের উপন্যাস রচনার ক্ষেত্রে অন্যতম পথিকৃৎ এবং একজন অসাধারণ জনপ্রিয় কথা-সাহিত্যিককে আমরা এখন প্রায় ভুলতেই বসেছি। তাই তাঁর সাহিত্যের যথাযথ মূল্যায়ন হওয়া এখন সময়ের অপরিহার্য দাবী।

তথ্য-পঞ্জী

১.        অধ্যাপক মুহম্মদ মনসুর উদ্দিন ঃ বঙ্গসাহিত্যে মুসলিম সাধনা, মাহে নও, কার্তিক, ১৩৬২, ৭ম বর্ষ ৭ম সংখ্যা, ও ডক্টর এনামুল হক ঃ মুসলিম বাঙ্গালা সাহিত্য।

২.       নাজিরুল ইসলাম মোহাম্মদ সুফিয়ান ঃ বাঙ্গালা সাহিত্যের নূতন ইতিহাস, তৃতীয় প্রকাশ, ১৯৯২, পৃ. ৫৮৩

৩.       ডক্টর মুহম্মদ এনামুল হক ঃ মুসলিম বাঙ্গালা সাহিত্য, পৃ. ৩২৫।

৪.        ডক্টর গোলাম সাকলায়েন ঃ মোহাম্মদ নজিবর সাহিত্যরত্ন, বাংলা একাডেমী পত্রিকা, পৌষ-চৈত্র, ১৩৬৪।

৫.       দৈনিক আজাদ, ২২শে চৈত্র, ১৩৬৫।

৬.       অধ্যাপক মনসুর উদ্দিন ঃ বাংলা সাহিত্যে মুসলিম সাধনা, প্রকাশকাল ১৩৭১, পৃ. ১৭৭।

৭.       ডক্টর মযহারুল ইসলাম ঃ মোহাম্মদ নজিবর রহমান, কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ড, ঢাকা, ১৯৭০, পৃ. ২।

৮.       মুহম্মদ মতিউর রহমান ঃ কথাশিল্পী মোহাম্মদ নজিবর রহমান সাহিত্যরত্ন, বাংলা একাডেমী পত্রিকা, জুলাই ২০০২- জুন ২০০৩, পৃ. ২৮-২৯।

৯.       ঐ

১০.      সাহিত্য পরিষদ পত্রিকা। রংপুর শাখা। পৃ. ১২৯, ত্রৈমাসিক, তৃতীয় ভাগ, সন ১৩১৫ বঙ্গাব্দ। সম্পাদক শ্রীপঞ্চানন সরকার, এম-এ, বি-এল।

১১.      দ্র. বুলবুল ইসলাম ঃ আনোয়ারা ঃ প্রাসঙ্গিক ইতিহাস।

১২.      আব্দুল কাদির ঃ কথাশিল্পী মোহাম্মদ নজিবর রহমান, উত্তরাধিকার, ৯ম বর্ষ, ষষ্ঠ সংখ্যা, জুন, ১৯৮১, বাংলা একাডেমী, ঢাকা।


Share with :

Facebook Twitter